বিশ্বের শীর্ষ ১০ উঁচু পর্বতশৃঙ্গ
বিশ্বের শীর্ষ ১০ উঁচু পর্বতশৃঙ্গ
পর্বতের চূড়াগুলো মেঘ ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। একসময় মানুষ মনে করত, এসব উঁচু শৃঙ্গে দেবতা বা দানবদের বাস। তবে আজকের দিনে এগুলো দুঃসাহসিক অভিযান ও মানবসাধনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বতশৃঙ্গের সবকটিই হিমালয় ও কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত, যেগুলোর প্রতিটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,০০০ মিটারেরও বেশি।
১. মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৯ মিটার / ২৯,০৩২ ফুট)
মাউন্ট এভারেস্ট পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, যা নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি নেপালে সাগরমাথা (আকাশের মাথা) এবং তিব্বতে চোমোলুংমা (বিশ্বের দেবী মা) নামে পরিচিত। টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এভারেস্টের উচ্চতা প্রতি বছর প্রায় ২ ইঞ্চি করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি (নিউজিল্যান্ড) ও তেনজিং নোরগে শেরপা (নেপাল) প্রথম এভারেস্ট জয় করেন। তবে ১৯২৪ সালে জর্জ ম্যালরি ও অ্যান্ড্রু আরভিং এর চূড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের মৃত্যু হয়।
২. কে২ (৮,৬১১ মিটার / ২৮,২৫১ ফুট)
কে২ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বতশৃঙ্গগুলোর একটি। এটি পাকিস্তান-চীন সীমান্তে কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত। এটির মৃত্যুহার প্রায় ২৩%, যা এভারেস্টের চেয়েও বেশি।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৪ সালে ইতালীয় পর্বতারোহী আর্দিতো দেসিও-এর নেতৃত্বে একটি দল প্রথম কে২ জয় করে।
৩. কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮,৫৮৬ মিটার / ২৮,১৬৯ ফুট)
ভারতের সিকিম ও নেপালের সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘা বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ। স্থানীয় ভাষায় এর অর্থ "তুষারের পাঁচ ধন", কারণ এর পাঁচটি চূড়া রয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মে এটি পবিত্র পর্বত হিসেবে বিবেচিত।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী জো ব্রাউন ও জর্জ ব্যান্ড প্রথম এর শীর্ষে পৌঁছান।
৪. লোৎসে (৮,৫১৬ মিটার / ২৭,৯৪০ ফুট)
এভারেস্টের খুব কাছেই নেপাল-তিব্বত সীমান্তে লোৎসে অবস্থিত। এটি বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৬ সালে সুইস পর্বতারোহী দল প্রথম লোৎসে জয় করে।
৫. মাকালু (৮,৪৮৫ মিটার / ২৭,৮৩৮ ফুট)
মাকালু হিমালয়ের একটি সুন্দর পিরামিডাকার পর্বত, যা নেপালে অবস্থিত। এর নাম এসেছে সংস্কৃত শব্দ "মহাকাল" (শিবের অপর নাম) থেকে।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৫ সালে ফরাসি পর্বতারোহীরা প্রথম মাকালু জয় করে।
৬. চো ওয়ু (৮,১৮৮ মিটার / ২৬,৮৬৪ ফুট)
চো ওয়ু নেপাল-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত। তিব্বতীয় ভাষায় এর অর্থ "ফিরোজা দেবী"। এটি তুলনামূলকভাবে সহজ আরোহণের জন্য পরিচিত, তাই অনেক অভিযাত্রী প্রথম ৮,০০০ মিটার শৃঙ্গ হিসেবে এটি বেছে নেন।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৪ সালে অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহীরা প্রথম চো ওয়ু জয় করে।
৭. ধৌলাগিরি (৮,১৬৭ মিটার / ২৬,৭৯৫ ফুট)
নেপালে অবস্থিত ধৌলাগিরির অর্থ "সুন্দর পর্বত"। এটি কালিগন্ডকি নদীর তীরে অবস্থিত, যা বিশ্বের গভীরতম গিরিখাত সৃষ্টি করেছে।
প্রথম আরোহণ: ১৯৬০ সালে সুইস ও অস্ট্রিয়ান পর্বতারোহীরা প্রথম ধৌলাগিরি জয় করে।
৮. মানাসলু (৮,১৬৩ মিটার / ২৬,৭৮১ ফুট)
নেপালের মানাসলু শব্দের অর্থ "আত্মার পর্বত"। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, যেখানে মৃত্যুহার প্রায় ১৭%।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৬ সালে জাপানি পর্বতারোহীরা প্রথম মানাসলু জয় করে।
৯. নাঙ্গা পর্বত (৮,১২৬ মিটার / ২৬,৬৬০ ফুট)
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত নাঙ্গা পর্বতের অর্থ "নগ্ন পর্বত"। এটি হিমালয়ের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এবং অত্যন্ত দুর্গম।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫৩ সালে জার্মান পর্বতারোহী হারমান বুহল প্রথম নাঙ্গা পর্বত জয় করেন।
১০. অন্নপূর্ণা (৮,০৯১ মিটার / ২৬,৫৪৫ ফুট)
নেপালের অন্নপূর্ণা বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক (মৃত্যুহার ~৩২%)।
প্রথম আরোহণ: ১৯৫০ সালে ফরাসি পর্বতারোহী মরিস হার্জগ ও লুইস লাচেনাল প্রথম অন্নপূর্ণা জয় করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি পর্বতশৃঙ্গ হিমালয় ও কারাকোরামে অবস্থিত। এভারেস্ট সর্বোচ্চ হলেও কে২ ও অন্নপূর্ণার মতো পর্বতগুলো আরও বেশি বিপজ্জনক। প্রতিটি পর্বতের নিজস্ব ইতিহাস, সৌন্দর্য ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা পর্বতারোহীদের কাছে অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়। প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টিগুলো শুধু উচ্চতাই নয়, মানুষের সাহসিকতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও প্রতীক।










মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন